ঢাকা বৃহঃস্পতিবার, ২১শে মার্চ ২০১৯, ৭ই চৈত্র ১৪২৫


লন্ডনে নতুন হাওয়া ভবন সিন্ডিকেট


৬ জানুয়ারী ২০১৯ ১৯:১৯

আপডেট:
২১ মার্চ ২০১৯ ০৩:৫০

প্রতিকি

নির্বাচনে পরাজয়ে লন্ডনে ‘নতুন হাওয়া ভবন’ সংশ্লিষ্টদের সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে ঢাকার হাওয়া ভবনের আদলে লন্ডনেও গড়ে উঠেছে একটি চক্র। লন্ডনে বসবাসরত অনেকেই যাকে ‘নতুন হাওয়া ভবন সিন্ডিকেট’ হিসাবে আখ্যায়িত করেন। এই চক্রটি নির্বাচনের বিজয়ের ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত ছিল। প্রত্যাশা অনুযায়ী ২ জানুয়ারী তারেক রহমানসহ ঘটা করে দেশে ফেরার পরিকল্পনা ছিল তাদের।

হাওয়া ভবনের সাবেক কথিত মুখপাত্র আশিক ইসলাম আমেরিকা থেকে ৩ মাস আগেই লন্ডনে এসে অবস্থান নেন। তিনি ঘনিষ্টদের সাথে আলোচনায় বলেন, ‘ভাইয়ার’ সাথে দেশে ফেরাই তাঁর লক্ষ্য।এছাড়া চক্রটিতে আরো রয়েছেন, হাওয়া ভবনের ঘনিষ্ট হিসাবে পরিচিত চার দলীয় জোট সরকারের সময়ে কলকাতায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিষ্টার হিসাবে দায়িত্বপালনকারী একজন সাংবাদিক। তারেক রহমান লন্ডনে আসার পরপরই তিনিও লন্ডনে পাড়ি জমান। তাঁর লক্ষ্য ছিল তারেক রহমানকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিজের আখের গোছানো। সেটাতে তিনি শতভাগ সফলই বলা চলে। তারেক রহমানের বক্তৃতার লেখক হিসাবে তিনি লন্ডনে পরিচিত। আন্দোলন টেলিভিশন নামে একটি অনলাইন টিভি পরিচালনা করেন তিনি।সরকার বিরোধী প্রপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে এই টিভির মূল কাজ। তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ এবং আশির্বাদপুষ্ট টেলিভিশনের পরিচালক হিসাবে তার গোপন চাঁদাবাজির ব্যবসাটাও মোটামুটি জমজমাট। দৃশ্যমান কোন আয় না থাকলেও তিনি এখন লন্ডনে বাড়ির মালিক হতে যাচ্ছেন। হাওয়া ভবনকে কাজে লাগিয়ে ২০০১ সালের পর বাংলাদেশেও বেশ কামাই করেছিলেন বলে খ্যাতি রয়েছে।
হাওয়া ভবন সংস্কৃতিতে অভিজ্ঞ এই দুইজন ছাড়াও নতুন করে চক্রে জড়িত হয়েছেন লন্ডনের কয়েকজন। লন্ডনের একটি ওয়ার্ড লেবার পার্টির বহিস্কৃত সেক্রেটারি হুমায়ূন কবীর, তারেক রহমানের বাল্য জীবনের বন্ধু বাংলাদেশ বিমানের সাবেক কর্মকর্তা মঈন,যুক্তরাজ্য বিএনপির সেক্রেটারি কয়সর এম আহমদস তাদের মধ্যে অন্যতম। পরস্পরের যোগসাজসে তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি, দলীয় পদ পদবী বিক্রি,ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌর নির্বাচনে মনোনয়ন ব্যবসাসহ নানা অভিযোগ বাতাসে উড়ে লন্ডনের রাস্তায়। সর্বশেষ ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনেও মনোনয়ন বানিজ্যের নানা কাহিনী লন্ডনের পথে ঘাটে এখন ‘ওপেন সিক্রেট’।

তারেক রহমানের সাথে দেখা করতে হলে কয়সর এম আহমদ এবং তারেক রহমানের গাড়ির ড্রাইভার হিসাবে পরিচিত ব্যক্তিগত সহকারির মন যোগাতে হয় আগে। যতবড় নেতাই হউক, বাংলাদেশসহ বিশ্বের যে কোন দেশ থেকে বিএনপি নেতারা তারেক রহমানের সাথে যোগাযোগ করতে হলে এই দু’জনের করুণা লাভ করা লাগে। তাদের অনুগত না হলে দলের জন্য যত রকমের ত্যাগই থাকুক তারা অচ্যুত হিসাবে গণ্য হন। তাদের সুদৃষ্টি ছাড়া কারো সাধ্য নেই তারেক রহমানের সাথে কোন রকমের যোগাযোগ করার।তারেক রহমানের আস্কারাতেই তারা দেখা করানো এবং যোগাযোগ করার নামে বিরাট বানিজ্য গড়ে তুলেছেন।দেখা করানোর জন্য তারা নানাভাবে বিভিন্ন অজুহাতে হাতিয়ে নেন মোটা অংকের টাকা। দলীয় পদ পদবী হলে তো আর কোন কথাই নেই। মোট কথা লন্ডনের এই চক্রটি বিভিন্ন কৌশলে পুরো বিএনপিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন। কে কোন মন্ত্রণালয় নেবেন নির্বাচনের আগে সেটাও তারা ঠিক করে রেখেছিল এই চক্র।

তারেক রহমানের সাথে কে কখন দেখা করেন,দৈনন্দিন কর্মসূচি কি কি,এসব তাদের নখদর্পণে। তাদের ঘনিষ্ট যোগাযোগ হচ্ছে ড্রাইবার হিসাবে পরিচিত ব্যক্তিগত সহকারি আবদুর রহমান সানির সাথে। আবদুর রহমান সানি তাদেরকে নিয়মিত আপডেট দিয়ে থাকেন। তারাও নিজেরা তারেক রহমানের সাথে দেখা করে কে কি কথা বলেছেন এবং তিনি কি বলেছেন সেটা পরবর্তীতে নিজেদের মধ্যে ‘শেয়ার’ করেন। এই চক্রের বাইরে যাতে কেউ তারেক রহমানের সাথে কোন রকমের যোগাযোগ করতে না পারে বা সম্পর্ক তৈরি করতে না পারে সেই লক্ষ্যে তারা সদা তৎপর থাকেন।
মাঝখানে এই চক্রের পরামর্শেই তারেক রহমান ইন্ডিয়ার প্রতি অনেকটা ঝুকে পড়েন। যা তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হুমায়ূন কবীরের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। গত সেপ্টেম্বরে হুমায়ূন ইন্ডিয়ায় গিয়ে বলেছিলেন, ১৯৮০ ও ৯০ দশকে ইন্ডিয়া প্রশ্নে বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি ভুল পথে পরিচালিত হয়েছিল। এই নীতি এখন জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে।
এদিকে দলের ভেতরে ব্যক্তিগত সহকারি আবদুর রহমান সানীর দৌরাত্য নিয়েও রয়েছে নানা কথা। তাঁর বিরাগভাজন হলে কেউ বিএনপিতে টিকতে পারে না বা কোন পদ লাভ করতে সক্ষম হয় না এটি মোটামুটি এখন প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশে তাঁর ভাই করিব আহমদকে কেন্দ্র করে পদ বাণিজ্য সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। বিএনপি ঘরানার অনেক ব্যবসায়ী কবীর আহমদের মাধ্যমে তারেক রহমানের সাথে দেখা করার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে লন্ডন সফর করেন। মনোনয়ন বাণিজ্যের সাথেও আবদুর রহমান সানির ভাই কবির আহমদ জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ আছে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একাধিক আসনে কবির আহমদ মনোনয়ন বানিজ্যের সাথে জড়িত ছিলেন, এমন কথা এখন মুখে মুখে প্রচারিত। বিএনপির রাজনীতিতে অখ্যাত কবির আহমদ এখন অনেক শক্তিশালি ভুমিকা পালন করেন তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে। কারন তাঁর ভাই হলেন তারেক রহমানের ড্রাইভার তথা ব্যক্তিগত সহকারি।

এবার আসুন জেনে নেই লন্ডনের ‘নতুন হাওয়া ভবন’ চক্রের এই মূল হোতাদের পরিচয় এবং অতীত:
আশিক ইসলাম এক সময় বাংলাদেশের একটি পত্রিকায় মফস্বল ডেস্কে শিক্ষনবীশ হিসাবে কাজ করতেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর এক পর্যায়ে তারেক রহমানের বিভিন্ন ব্যক্তিগত ফুট ফরমায়েশ শোনার জন্য আশিক ইসলামকে তাঁর দফতরে সংযুক্ত করা হয়। বিএনপি চেয়ারপার্সনের জন্য হাওয়াভবনে রাজনৈতিক কার্যালয় তৈরির পর তারেক রহমানের জন্য একটি কক্ষ সেখানে রাখা হয়। সে সুবাদে আশিক ইসলাম হাওয়া ভবনের স্টাফ হিসাবে যুক্ত হন। তখন তিনি নিজেই হাওয়া ভবনের মুখপাত্র হিসাবে পরিচয় দিতেন।২০০১ সালে চার দলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর তাঁকে তারেক রহমানের প্রতিনিধি হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সহকারি প্রেসসচিব হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে নিয়োগ পান। এরপর থেকেই আশিক ইসলাম হয়ে উঠেন মহা ক্ষমতাধর ব্যক্তি। এখনো

তিনি ঘনিষ্টজনদের সাথে আলাপে বলে থাকেন, তাদের সামনে এসে মন্ত্রীরা দাড়িয়ে থাকতেন। ওয়ান-ইলেভেনের সময় তিনি আমেরিকা পাড়ি জমান। এখন মাঝে মধ্যে লন্ডনে আসেন রাজনৈতিক বাণিজ্যের নেশায়।

হুমায়ূন কবীর বাংলাদেশী বৃটিশ নাগরিক।লন্ডনে বড় হয়েছেন এবং পড়াশোনাও করেছেন লন্ডনে। এক সময় লেবার পার্টি করতেন। একটি কাউন্সিলে ওয়ার্ড সেক্রেটারিও হয়েছিলেন। কিন্তু দুষ্কর্মের কারনে লেবার পার্টি তাঁকে বহিস্কার করে। লেবারপার্টি করাকালীন পূর্ব লন্ডনের নিউহাম কাউন্সিলে গার্বেজ সেকশনে কাজ করতেন তিনি। চুক্তিভিত্তিক এই চাকুরি চলে যাওয়ার পর রীতিমত ভবঘুরে জীবন যাপন ছিল তাঁর। হাওয়া ভবনের মুখপাত্র খ্যাত আশিক ইসলামকে ম্যানেজ করে তিনি ভিড়ে যান তারেক রহমানের সাথে। এখন বিএনপি’র নীতি নির্ধারকদের একজন হিসাবে নিজেকে পরিচয় দেন। দিনরাত ব্যস্ত থাকেন কাকে মন্ত্রী বানানো যায় তাই নিয়ে। তারেক রহমান বাণিজ্যই এখন তাঁর আয়ের একমাত্র উৎস।

আবদুর রহমান সানী তারেক রহমানের গাড়ির ড্রাইভার তথা ব্যক্তিগত সহকারি হিসাবে পরিচিত। তবে বিএনপিতে তাঁর অবস্থান জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদেরও উপরে। স্থায়ী কমিটির কেউ যদি তারেক রহমানের সাথে যোগাযোগ করতে চান তবে আবদুর রহমান সানীকে ম্যানেজ করা লাগে আগে। লন্ডনে যুক্তরাজ্য বিএনপি তাঁর কথায় পরিচালিত হয়।কমিটিতে কে থাকবে বা থাকবেন না এনিয়ে সিদ্ধান্ত হয় আবদুর রহমানের মতামতের ভিত্তিতে। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও আবদুর রহমানের প্রভাব বিস্তার লাভ করে সম্প্রতি। দলের নীতি নির্ধারণে তাঁর ভুমিকার কথা নিজেই অনুগতদের কাছে বলে বেড়ান তিনি। আবদুর রহমান সানী জীবন জীবিকার তাগিদে লন্ডনে এসেছিলেন। দীর্ঘদিন অবৈধভাবে লন্ডনে বসবাস করেন। ঘটনাচক্রে তারেক রহমানের নজরে আসেন তিনি। ধীরে ধীরে ঘনিষ্ট হয়ে উঠেন। এক পর্যায়ে নিয়োগ পান ব্যক্তিগত ফুট ফরমায়েশের জন্য। তাঁকে আর পিছনে ফিরে তাকনো লাগেনি। এখন কাড়ি কাড়ি টাকার মালিক। মূল পুজি তারেক রহমান। উত্তরায় বিশাল বাড়ি নিয়ে এখন তার পরিবারের সকল সদস্য ঢাকায় বসবাস করেন। লন্ডনেও যুক্তরাজ্য বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক কয়সর এম আহমদের ব্যবসায়িক পার্টনার তিনি। তারেক রহমানের সান্নিধ্য যেন তাঁকে টাকার খনির সন্ধান দিয়েছে।

কয়সর এম আহমদ:১৯৯৬ সালে লন্ডনে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছিলেন। চাকরি করতেন হোটেল বয় হিসাবে। কখনো কখনো ট্যাক্সিও চালাতেন। তবে যুক্তরাজ্য বিএনপি’র সেক্রেটারি হওয়ার পর তাকে টাকার খনি ধরা দিয়েছে।এখন তিনি কাড়ি কাড়ি টাকার মালিক। একাধিক ব্যবসার মালিক হয়েছেন যুক্তরাজ্য বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর। তারেক রহমান বানিজ্যই হচ্ছে তাঁর আয়ের মূল উৎস। তাঁকে বাইপাস করে তারেক রহমানের সাথে কারো দেখা হওয়ার সুযোগ নেই।

নতুনসময়/এসএ/আইএ