ঢাকা রবিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২১, ৫ই আশ্বিন ১৪২৮


এবার দৌড়ের উপর মনির খান


১ আগস্ট ২০২১ ২০:০৩

ফাইল ছবি

হেলেনা জাহাঙ্গীরকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শেষ না হতেই আলোচনায় এসেছেন মো. মনির খান, যিনি বাংলাদেশ জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদ নামে আরেকটি ভুঁইফোঁড় সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। আওয়ামী লীগের সাবেক ধর্মবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। এখন দলের কোনো পর্যায়ের কমিটি-উপকমিটির পদে নেই তিনি। কামরাঙ্গীরচরের মনির খান নিজেকে পরিচয় দেন আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে, উপকমিটির সদস্য হিসেবে। অথচ যে উপকমিটির সদস্য পরিচয় দেন, সেই উপকমিটি এখনো গঠিতই হয়নি। তাকে চেনেনও না কেন্দ্রীয় কমিটির সংশ্লিষ্ট সম্পাদক।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন আয়োজনে মনির খান দলীয় সভাপতি ও শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিজের ছবি প্রকাশ করেন বরাবর। তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এমন ছবি পাওয়া যায় অহরহ। অভিযোগ রয়েছে, এসব ছবি এডিট করা।

মনির খানের দাবি, ছবিগুলো আসল। দলের অনেক শীর্ষ নেতা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, তাকে নজরদারীর মধ্যে রাখা হয়েছে। যে কোন সময় আইনের আওতায় আনা হবে।

২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে আরও অনেকের সঙ্গে মনির খানও দলের মনোনয়ন ফরম কিনেছিলেন। সেটাইকেই এখন তার পরিচয়ের প্রধান ট্যাগ করেছেন। ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নিজের পরিচয় হিসেবে লিখেছেন- ‘২০১৮ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এমপি প্রার্থী হয়ে ঢাকা-২ আসনের মনোনয়ন কিনেছিলাম।’ তার এমন পরিচয় প্রকাশকে হাস্যকর বলছেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িতরা।
‘বঙ্গবন্ধুকে কটূক্তিকারী তারেক জিয়ার মামলার বাদী’ পরিচয় দেওয়ার পাশাপাশি মনির খান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক এবং সাবেক ধর্মবিষয়ক উপকমিটির সদস্য বলেও ফেসবুকে প্রচার করে আসছেন। একই পরিচয় তিনি সব ধরনের সামাজিক ও আনুষ্ঠানিকতায় ব্যবহার করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মনির খানের ধর্মবিষয়ক উপকমিটির সদস্য পরিচয়টি ভুয়া। আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক সিরাজুল মোস্তাফার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক উপকমিটি গত সম্মেলনে বিলুপ্ত হয়। এরপর আর কোনো ধর্মবিষয়ক উপকমিটি দেয়নি আওয়ামী লীগ।

সিরাজুল মোস্তাফা বলেন, ‘আমাকে গত নভেম্বরে ধর্মবিষয়ক সম্পাদক করা হয়েছে। আমি এখনো কোনো কমিটি দেইনি। কেউ যদি নিজেকে ধর্মবিষয়ক উপকমিটির সদস্য পরিচয় দেয়, তাহলে সেটা ভুল। কারণ এখন কোনো কমিটিই নেই।’

উপকমিটির সদস্য পরিচয় দেওয়া মনির খানের বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক বলেন, ‘আমি এই নামে কাউকে চিনি না, জানিও না।’

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক এই সভাপতি মনে করেন, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থে অনেকেই রাতারাতি আওয়ামী লীগ নেতা বনে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। ক্ষমতা অর্জন ও আর্থিকভাবে লাভবান হতে কিছু মানুষ আওয়ামী লীগের নাম ব্যবহার করছে। তাদের কারণে আওয়ামী লীগের সম্মানে আঘাত লাগছে।

বরাবরই নিজেকে আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয় দেওয়া মনির খানের মুখে নিয়মিত গল্প- দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তার ওঠাবসা। নিজেকে গার্মেন্টস ব্যবসায়ীও পরিচয় দেন তিনি। মূলত একসময় দর্জির কাজ করা মনির খান স্থানীয়ভাবে দর্জি মনির হিসেবে বেশি পরিচিত।


নিজের অবস্থান শক্ত করতে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম সামনে রেখে ‘শেখ হাসিনা পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন করেছেন মনির খান। তিনি জানান, এটি আওয়ামী লীগের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন নয়। আওয়ামী লীগের হাতকে মজবুত করতে এ সংগঠন গড়ে তুলেছেন তিনি।


বিভিন্ন জেলা, থানা ও ওয়ার্ড কমিটি দেয়া হয়েছে এই শেখ হাসিনা পরিষদ থেকে। মনির খানের ভাষ্যমতে, আটটি জেলা কমিটি, বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড কমিটিসহ পাঁচ হাজারের বেশি সদস্য আছে তার এই সংগঠনে।


সংগঠনের সঙ্গে কারা জড়িত- এমন প্রশ্নের জবাবে মনির বলেন, ‘এখানে চাকরিজীবী, বিভিন্ন পেশাজীবী, ব্যবসায়ীরা আছেন। তারা সবাই আওয়ামী লীগের অনুসারী।’

ফেসবুক অ্যাকাউন্টে মনির খান নিজের যে পরিচয় দিয়েছেন, সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান। আমার বাবা-দাদা সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আমি কখনো কারও কাছে একটা আবদার নিয়ে যাইনি। শুধু দলের জন্য কাজ করেছি। আমি গত নির্বাচনে ঢাকা-২ আসনে এমপি পদে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছিলাম। কিন্তু আমার ওপর হামলা হয়েছে। আমার প্রতিপক্ষ আমার ওপর হামলা চালায়।’

ঢাকা-২ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। কে হামলা করেছেন বা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত এমন প্রশ্নের জবাবে মনির বলেন, ‘আমি তা সরাসরি বলব না।’ ঢাকা-২ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য দলের মনোনয়ন ফরম কেনার পর থেকে তার পেছনে দলের লোকজন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন বলে দাবি তার।

ফেসবুকে নেতানেত্রীদের সঙ্গে তার ছবির প্রসঙ্গটিও উঠে আসে আলাপে। তিনি বলেন, ‘আমার ফেসবুকে যে ছবি দেয়া আছে, সেগুলো বলা হচ্ছে এডিট করা। কোনো ছবি এডিট করা নাই। সব আসল ছবি। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। আমি কি এখন আত্মহত্যা করব?’

দলের পরিচয় ব্যবহার করে নিজের অতিরঞ্জন উপস্থাপন, আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ গঠন ও কমিটি বাণিজ্য, কেন্দ্রীয় নেতাদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগে সম্প্রতি আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপকমিটির সদস্যপদ থেকে বাদ দেওয়া হয় হেলেনা জাহাঙ্গীরকে। পরে তার বাসায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তল্লাশি চালালে সেখানে পাওয়া যায় মাদক, ওয়াকিটকিসহ নানান কিছু। বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে থাকা হেলেনার বিরুদ্ধে তিনটি মামলাও হয়েছে।

নানা মাধ্যমে নিজেকে মেলে ধরার চেষ্টায় মত্ত মনির খান। তার এ ধরনের বেসামাল আচরণ তাকে করে তুলেছে সমালোচিত। তবে হেলেনার মতো দল থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়ার কিছু নেই। কেননা তিনি দলের কোনো পর্যায়ের কোনো পদধারী নেতা নন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার যুগ্ম কমিশনার হারুন-অর-রশীদ বলেন, ‘মনির খান প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ব্যক্তির ছবির সঙ্গে নিজের ছবি জুড়ে দিয়েছেন। তিনি অসৎ উদ্দেশ্যে এসব ছবি ব্যবহার করেছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। তাকে নজরদারিতে রেখেছি, যে কোনো সময় গ্রেপ্তার করা হবে।’