ঢাকা সোমবার, ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৮ই আশ্বিন ১৪২৬


সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি


১৫ জুলাই ২০১৯ ০৯:৫০

আপডেট:
১৫ জুলাই ২০১৯ ১২:২৯

ছবি সংগৃহিত

আমাদের প্রজন্ম, যারা বাংলাদেশকে স্বাধীনভাবে আবির্ভূত হতে দেখেছে এবং তার পেছনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে অসামান্য অবদান তা প্রত্যক্ষ করেছে, তাদের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক চিন্তাধারার মূল্যায়ন সহজ ভাষায় ব্যক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। আমি নিজে যখনই বঙ্গবন্ধুর কথা ভাবি, তখনই আমার প্রথমে মনে পড়ে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা। আমি তখন ঢাকাতেই ছিলাম। বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষ করে ১৯৭০-এর ডিসেম্বর মাসে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেছি। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসেই সেই ঐতিহাসিক নির্বাচন হয়, যাতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অভূতপূর্ব বিজয় লাভ করে। আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে জয়লাভ করে। ছয় দফা এবং এগারো দফার ভিত্তিতে নির্বাচনী ইশতেহার রচিত হয় এবং নির্বাচনী প্রচার চালানো হয়। সমগ্র জনসাধারণকে অভূতপূর্বভাবে ঐক্যবদ্ধ করা হয় বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনের এই বিশাল সাফল্যের পর থেকেই আমরা বিপুল আশা-উদ্দীপনার মধ্যে ছিলাম। বাংলাদেশ যে সৃষ্টি হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে আমাদের মনে আর কোনো সন্দেহ ছিল না। তখন একমাত্র প্রশ্ন ছিল আমরা কি শান্তিপূর্ণভাবে আলোচনার মাধ্যমে এই স্বাধীন দেশ সৃষ্টি করতে পারব, নাকি আমাদের একটা বিরাট রক্তাক্ত সংঘাতের পথে যেতে হবে।

আমার মনে পড়ে, ১ মার্চে যখন জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিত করলেন এবং তার পরে যখন বঙ্গবন্ধু ৩ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন, বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষই তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যবর্গ, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় সবাই পাকিস্তান সরকারের পক্ষ ত্যাগ করে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁদের আনুগত্য প্রকাশ করলেন। পৃথিবীর আর কোনো দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট দেশটির জাতীয় স্বাধীনতার স্বীকৃতি না পাওয়া পর্যন্ত প্রশাসনকে এভাবে তাদের আনুগত্য পরিবর্তন করতে দেখা যায়নি। এর একটি প্রধান কারণ হলো বঙ্গবন্ধু আহূত অসহযোগ আন্দোলন এমনই ব্যাপক ও সর্বজনগ্রাহ্য ব্যাপার হয়ে পড়েছিল যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সচল রাখার প্রয়োজনে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালেই বঙ্গবন্ধুকে সারা দেশের শাসনভার পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয়।

মার্চ মাসের ২ তারিখের পর থেকেই প্রতিদিন আমি ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতাম। দেখতাম রাস্তায় হাজার হাজার লোক, কিন্তু সবাই ছিল শান্তিপূর্ণ। সবারই মনে এবং মুখে একই কথা, যা ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানের (আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দেওয়া বক্তৃতায় বললেন। তিনি বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। আমি নিজে সেদিন রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলাম, দেখেছিলাম লাখো মানুষের ঢল, সবার মনে একই আশা এবং উদ্দীপনা।

আমার মনে আছে, আমি তখন একটি কথা খুবই ভাবতাম। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমার কাছে ফরাসি দার্শনিক রুশোর ‘সামাজিক চুক্তি’ (social contract) বইটি খুব প্রিয় ছিল, বিশেষ করে রুশোর একটি তাত্ত্বিক ধারণা ‘‘general will” যখন পড়তাম এবং পরবর্তীকালে ক্লাসে আমি এটা পড়াতাম, তখন ভাবতাম general will কেমন হতে পারে। ১৯৭১ সালের ২ মার্চের পর যখন আমি অসহযোগ আন্দোলনে হাজার হাজার জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখলাম এবং সবার মুখে মুখে শুধু স্বাধীনতার কথা শুনতাম তখন বুঝতে পারলাম রুশোর general will কথাটির অর্থ কী। আমি স্পষ্টই দেখতে পেলাম আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে general will সৃষ্টি হয়েছে। সারা দেশের মানুষ এখন ঐক্যবদ্ধ স্বাধীনতার দাবির ডাকে। এই general will, এই ঐক্যবদ্ধ জনমত গঠিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর বহু বছরের সাধনা, ত্যাগ এবং কর্মকাণ্ডের ফলে।

আমি নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে করি যে আমি নিজের চোখে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসকে এবং বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ভূমিকাকে প্রত্যক্ষ করেছি। খুব কম লোকেরই ভাগ্য হয় ইতিহাস সৃষ্টি হতে দেখা। আমি ইতিহাস সৃষ্টি হতে দেখেছি। স্বাধিকার আন্দোলনকে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপান্তরিত হতে দেখেছি। এসব ঐতিহাসিক ঘটনার মূল নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অসম্ভব সম্ভব করতে দেখেছি।

আমি আগেই বলেছি, সে সময়ের আমাদের অনুভূতি যাঁরা তখন উপস্থিত ছিলেন না, যাঁরা চোখে দেখেননি এবং সেই অনুভূতি যাঁদের হৃদয়ে তখন স্পর্শ করেনি, তাঁদের ঠিক ভাষায় বলে বোঝানো কষ্টকর। পৃথিবীর অনেক দেশেই অনেক সময়ে অনেক নেতা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। দেশ পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু খুব অল্পসংখ্যক নেতাই ইতিহাস রচনা করতে পেরেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তেমনই একজন অনন্য কালজয়ী ইতিহাসের মহানায়ক।

যদিও আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পর ৪৮ বছর এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ৪৩ বছর অতিবাহিত হয়েছে, তবু এখন পর্যন্ত সর্বাঙ্গীণভাবে গবেষণালব্ধ বঙ্গবন্ধুর কোনো আত্মজীবনী লেখা হয়নি। আমার মনে হয় বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কিছু জানতে হলে, বিশেষ করে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা এবং কর্মকাণ্ডের উৎস খুঁজতে হলে তাঁর নিজের লেখা ডায়েরি যার ওপর ভিত্তি করে দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (২০১২) এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ (২০১৭) তাই হলো সবচেয়ে মূল্যবান সূত্র। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি তাঁর ছোটবেলা, যৌবনের জীবনদর্শন এবং রাজনীতি সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। অসমাপ্ত হলেও এই বইটি থেকে তাঁর রাজনৈতিক ধ্যানধারণা খুবই পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। অন্য বইটি, ‘কারাগারের রোজনামচা’ও তাঁর ডায়েরিভিত্তিক। এই বইটিতে ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনের সময়ের তাঁর কারাগারের দিনগুলোর বিশদ বিবরণ আছে। এখানেও তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা সুস্পষ্ট। বিশেষ করে স্বৈরাচারী রাষ্ট্র জনগণের আন্দোলনকে দমন করার জন্য কত রকমের নিপীড়ন চালাতে পারে, তার বর্ণনা তিনি দিয়েছেন। এ ছাড়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কত প্রয়োজনীয়, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা বইটির বিভিন্ন স্থানে আমরা পাই।

আমার আজকের এই প্রবন্ধ প্রধানত এই দুটি বই এবং বঙ্গবন্ধুর অন্যান্য ভাষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছি, যাতে যতটা সম্ভব আমরা বঙ্গবন্ধুর নিজের ভাষা শুনতে পাই। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তাধারা বুঝতে হলে প্রথমেই আমাদের মনে রাখা দরকার বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের বেশির ভাগ অংশই কেটেছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর খুবই অল্প সময়ের জন্য—সাড়ে তিন বছর—তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন। জীবনের বেশির ভাগ সময়ই তিনি ব্যয় করেছেন ঔপনিবেশিক ও অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। প্রথমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক এবং তারপর পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি বহুদিন সংগ্রাম করেছেন বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের জন্য।

রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন কোটি কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা। একদিকে তাঁর ছিল অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতা, অন্যদিকে অতুলনীয় বাগ্মিতা। সাধারণত একই ব্যক্তির মধ্যে আমরা এই দুই গুণের সমাহার দেখি না। তিনি নিজেই লিখেছেন যে তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে দল সংঘটনের কাজে তাঁর বেশি উৎসাহ ছিল। তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তিনি লিখেছেন যে যখন তিনি কলকাতায় ছাত্র ছিলেন, তখন আবুল হাশিম সাহেব, মওলানা আজাদ সোবহানী, যিনি একজন দার্শনিক ছিলেন, তাঁকে আমন্ত্রণ করে এনেছিলেন ছাত্রদের ক্লাস নেওয়ার জন্য।

বঙ্গবন্ধু লিখেছেন:
‘আমার সহকর্মীরা অধিক রাত পর্যন্ত তাঁর আলোচনা শুনতেন। আমার পক্ষে ধৈর্য ধরে বসে থাকা কষ্টকর। কিছু সময় যোগদান করেই ভাগতাম। আমি আমার বন্ধুদের বলতাম, ‘‘তোমরা পণ্ডিত হও, আমার অনেক কাজ। আগে পাকিস্তান আনতে দাও, তারপর বসে বসে আলোচনা করা যাবে।” ... কাজ তো থাকতই ছাত্রদের সাথে, দল তো ঠিক রাখতে হবে।”’

তবে তাত্ত্বিক না হলেও বঙ্গবন্ধুর সুনির্দিষ্ট কিছু আদর্শ ছিল, মূল্যবোধ ছিল, লক্ষ্য ছিল এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তিনি একনিষ্ঠভাবে এবং নিরলস কাজ করেছেন। তাঁর কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই আমরা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা উপলব্ধি করতে পারি। মাত্র তিনটি বাক্যেই বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মপরিচিতি ও মূল্যবোধ অত্যন্ত পরিষ্কার করেছেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র প্রথমেই বঙ্গবন্ধুর একটি উদ্ধৃতি রয়েছে, যা তিনি ১৯৭৩ সালের মে মাসের ৩ তারিখে লিখেছেন। তিনি লিখেছেন:
‘একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্প্রীতির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে’।

এই উদ্ধৃতি থেকে এটা স্পষ্ট যে বঙ্গবন্ধু নিজেকে একাধারে মানুষ এবং তার সঙ্গে বাঙালি হিসেবে আত্মপরিচয় স্বীকৃতি দিচ্ছেন। তাঁর কর্মপ্রেরণার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করছেন বাঙালি এবং মানবসম্প্রদায়ের জন্য তাঁর ভালোবাসা। এই আত্মপরিচয় থেকেই আমরা উপলব্ধি করতে পারি তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারার চারটি বৈশিষ্ট্য: বাঙালি জাতিসত্তা, জনসম্প্রীতি, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সমাজতন্ত্র।

তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারার অবশ্যই আরও অনেক বৈশিষ্ট্য ছিল। কিন্তু আজকের এই প্রবন্ধের আলোচনা আমি এই চারটি বৈশিষ্ট্যেই সীমাবদ্ধ রাখব।

রাজনৈতিক জীবনের প্রথম থেকেই বঙ্গবন্ধুর বাঙালি আত্মপরিচয়, স্বকীয়তা এবং তা নিয়ে গর্ববোধের পরিচয় পাই। তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন, কিন্তু আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন সে সময় জনসভায় পাকিস্তান আন্দোলনকে তিনি উত্থাপিত করতেন লাহোর প্রস্তাবের ধারণায়, দুটি মুসলমান প্রধান সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে:
‘পাকিস্তান দুইটা হবে, লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে। একটা বাংলা ও আসাম নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র; আর একটা পশ্চিম পাকিস্তান স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে—পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, সীমান্ত ও সিন্দু প্রদেশ নিয়ে।’

বাঙালি জাতিসত্তা সম্পর্কে সচেতনতার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল দরিদ্র, নির্যাতিত ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন এই ভেবে যে এই নতুন রাষ্ট্রে দরিদ্র মুসলমান কৃষক জমিদার শ্রেণির নির্যাতন থেকে মুক্তি পাবে। তিনি সব সময় স্বাধীনতার আন্দোলনকে শুধু ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার সংগ্রাম হিসেবে দেখেননি, তিনি এটাকে দেখেছেন নির্যাতিত দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম হিসেবে। তাঁর জাতীয়তাবাদের ধ্যানধারণার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সুষম সমাজব্যবস্থার চিন্তা। বাঙালির জাতিসত্তার স্বীকৃতির আন্দোলনকে তিনি সব সময় দেখেছেন একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন হিসেবে, শোষিত–বঞ্চিত মানুষের মুক্তির আন্দোলন হিসেবে। তাই ৭ মার্চ ১৯৭১-এ তিনি একই সঙ্গে ডাক দেন স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামের জন্য।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে কলকাতায় ছাত্র থাকাকালে যখন তিনি মুসলিম লীগে যোগ দেন, তখন বঙ্গবন্ধু ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিমের দলে, যাঁরা প্রগতিশীল বলে পরিচিত ছিলেন। আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখছেন:
‘শহীদ সাহেবের নেতৃত্বে আমরা বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকেরা মুসলিম লীগকে জনগণের লীগে পরিণত করতে চাই। মুসলিম লীগ তখন পর্যন্ত জনগণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় নাই। জমিদার, জোতদার ও খান বাহাদুর নবাবদের প্রতিষ্ঠান ছিল।’ 

মুসলিম লীগের এই পুনর্গঠনের কাজে বঙ্গবন্ধু নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করেন। আত্মজীবনীতে তিনি লিখছেন:
‘মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠান পূর্বে ছিল খান সাহেব, খান বাহাদুর ও ব্রিটিশ খেতাবধারীদের হাতে, আর এদের সাথে ছিল জমিদার, জোতদার শ্রেণির লোকেরা। এদের দ্বারা কোনো দিন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হতো না। শহীদ সাহেব ও হাশিম সাহেব যদি বাংলার যুবক ও ছাত্রদের মধ্যে মুসলিম লীগকে জনপ্রিয় না করতে পারতেন এবং বুদ্ধিজীবী শ্রেণিতে টেনে আনতে না পারতেন, তা হলে কোনো দিনও পাকিস্তান আন্দোলন বাংলার কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারত না।’
লাহোর প্রস্তাব যখন ১৯৪৬ সালের মুসলিম লীগ কনভেনশনে পরিবর্তন করা হলো এবং দুটি পাকিস্তান রাষ্ট্রের বদলে শুধু একটি রাষ্ট্রের কথা প্রস্তাবিত হলো, সেই পরিবর্তন সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধু আত্মজীবনীতে লিখছেন যে তখন তাদের বলা হয়েছিল যে কাউন্সিলের প্রস্তাব পরিবর্তন করা হয় নাই, এটা কনভেনশনের প্রস্তাব। এরপর ১৯৪৭ সালে সোহরাওয়ার্দী এবং শরৎবসুর উদ্যোগে বাংলাকে ভাগ না করে যুক্ত বাংলার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন সেই উদ্যোগের সঙ্গেও বঙ্গবন্ধু যুক্ত ছিলেন। এক পাকিস্তান সৃষ্টি নিয়ে তাঁর মনে যে প্রশ্ন এবং পরবর্তীতে যুক্ত বাংলার উদ্যোগের সঙ্গে তাঁর যুক্ত হওয়ার প্রচেষ্টা থেকে বোঝা যায় যে বঙ্গবন্ধু ছাত্র অবস্থা থেকেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফিরে প্রগতিশীল সংগঠন ও বাঙালির বিভিন্ন অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য তিনি কারাবরণ করেন। তবে সে সময় তিনি যে শুধু ভাষার অধিকার নিয়েই সংগ্রাম করেছেন তা নয়, গরিব এবং নির্যাতিত মানুষের পাশে থেকে অন্যায়–অবিচারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিবাদী আন্দোলনে যোগ দেন, যেমন কর্ডন প্রথার বিরুদ্ধে, জিন্নাহ ফান্ডের বিরুদ্ধে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারীদের সমর্থনে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি গণতন্ত্রের স্বার্থে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার সপক্ষে যে যুক্তি তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন তা হলো:
‘আর মুসলিম লীগের পিছনে ঘুরে লাভ নেই, এ প্রতিষ্ঠান এখন গণবিচ্ছিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে...বিরোধী দল সৃষ্টি করতে না পারলে এ দেশে একনায়কত্ব চলবে।’

এরপর ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের (প্রথমে আওয়ামী মুসলিম লীগ) প্রতিষ্ঠালগ্নে তিনি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন যদিও তিনি তখন কারাগারে ছিলেন। ১৯৫৩ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনী জোটের একজন সদস্য হিসেবে বঙ্গবন্ধু প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম দফা ছিল পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন এবং বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া। ১৯৫৫ সালের মে মাসে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। গণপরিষদের এক বক্তৃতায় তিনি বাঙালির স্বকীয়তা এবং বাঙালিদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন:
‘ওরা পূর্ব বাংলা নামের পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তান নাম রাখতে চায়। আমরা বহুবার দাবি জানিয়েছি আপনারা এটাকে বাংলা নামে ডাকেন। বাংলা শব্দটার একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে, আছে এর একটা ঐতিহ্য।...বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে কি হবে? যুক্ত নির্বাচনী এলাকা গঠনের প্রশ্নটারই কি সমাধান? আমাদের স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কেই বা কি ভাবছেন?...আমার ঐ অংশের [পশ্চিম পাকিস্তান] বন্ধুদের কাছে আবেদন জানাব যে আমাদের জনগণের রেফারেন্ডাম অথবা গণভোটের মাধ্যমে দেওয়া রায়কে মেনে নেন।’

অবশ্য বাংলার ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি রক্ষার পাশাপাশি তাঁর বৃহত্তর সংগ্রাম ছিল বাঙালি জাতিকে বিভিন্ন শোষণের হাত থেকে মুক্ত করা এবং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন:
‘পূর্ব বাংলার সম্পদ কেড়ে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানকে কত তাড়াতাড়ি গড়া যায় একদল পশ্চিমা নেতা ও বড় বড় সরকারি কর্মচারীরা গোপনে সে কাজ করে চলেছিল।...শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষ যে আশা নিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন, যে পাকিস্তান আন্দোলনে শরিক হয়ে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে তাদের অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে কোনো নজর দেওয়াই তারা দরকার মনে করল না।’ 

১৯৫৫ সালে কাউন্সিল সেশনে আওয়ামী লীগের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি অপসারণ করা হয় এবং বঙ্গবন্ধু আবারও দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন, যার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে অত্যন্ত সীমিত ক্ষমতা ন্যস্ত করার প্রস্তাব করা হয়। সেই বছর মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ছয় দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে সারা বাংলায় গণসংযোগ সফর শুরু করেন। ১৯৬৬ সালের পর থেকে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতীয়তাবাদের অ্যাজেন্ডাকে একমাত্র দাবি হিসেবে উপস্থাপন করেন। ছয় দফা আন্দোলন শুরু করার পর বঙ্গবন্ধু পুনরায় কারাবরণ করেন এবং কারাগারে থাকা অবস্থায় পাকিস্তান সরকার তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করে (আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা)। ১৯৬৯ সালে প্রচণ্ড ছাত্র আন্দোলনের মুখে আইয়ুব সরকারের পতন হয় এবং বঙ্গবন্ধু কারামুক্ত হন। কারামুক্তির পর ছাত্রসমাজ তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় বঙ্গবন্ধু ‘বাংলাদেশ’ ও ‘জয় বাংলা’ এই দুটি স্লোগান ব্যবহার করতে আরম্ভ করেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭০—মাত্র চার বছরের মধ্যে বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতার পক্ষে ঐকমত্যে আনতে পারেন। এত অল্প সময়ের মধ্যে পৃথিবীতে অন্য কোনো স্থানে জনগণকে এমন সংঘবদ্ধ করা সম্ভব হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

বঙ্গবন্ধু সারা জীবন আন্দোলনের রাজনীতি করেছেন ও দল গঠন করেছেন, মুক্তির কথা বলেছেন। তিনি লাখ লাখ জনতাকে সংঘবদ্ধ করতেন আন্দোলনে, কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল অহিংস এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, যাতে গণতান্ত্রিক পন্থার মধ্য দিয়ে জনমত সৃষ্টি করে অধিকার আদায় করা যায় এবং অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তন আনা যায়।

‘কারাগারের রোজনামচা’য় বিভিন্ন জায়গায় তিনি অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কুফল সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন। গণতান্ত্রিক উপায়ে বিরোধী রাজনীতি না করতে পারলে যে দেশ সন্ত্রাসী রাজনীতির দিকে অগ্রসর হতে পারে, তার আশঙ্কাও তিনি প্রকাশ করেছেন। ছয় দফা আন্দোলনের সময় পাকিস্তানি সরকার যখন আওয়ামী লীগ কর্মীদের নির্বিচারে জেল–জুলুমের সম্মুখীন করে এবং গণমাধ্যমে খবর প্রচারের বিরুদ্ধে নির্দেশনা দেয়, তখন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর দুর্ভাবনার কথা তিনি ব্যক্ত করেছেন।

তিনি লিখছেন:
‘খবরের কাগজ এসে গেল। দেখে আমি শিহরিয়া উঠলাম, এ দেশ থেকে গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথ চিরদিনের জন্য এরা বন্ধ করে দিতে যাচ্ছে। জাতীয় পরিষদে “সরকারী গোপন তথ্য আইন সংশোধনী বিল” আনা হয়েছে। কেউ সমালোচনামূলক যে কোনো কথা বলুন না কেন মামলা দায়ের হবে। ... বক্তৃতা করার জন্য ১২৪ ধারা ৭(৩)...এবং ডিপি আর রুল দিয়ে আমার বিরুদ্ধে মোটমাট পাঁচটি মামলা আর অন্যান্য আরও তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।...আমার ভয় হচ্ছে এরা পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির দিকে নিয়ে যেতেছে। আমরা এ পথে বিশ্বাস করি না।...আমরা যারা গণতন্ত্রের পথে দেশের মঙ্গল করতে চাই, আমাদের পথ বন্ধ হতে চলেছে।’

১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭০—এই ২৩ বছরে তাঁর নেতৃত্বে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ক্রমাগত বেগবান হয়েছে, কিন্তু তিনি সব সময় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই ছিলেন। যখনই পাকিস্তানি শাসকেরা নির্বাচনের সুযোগ দিয়েছে, তিনি তাতে অংশগ্রহণ করেছেন, যদিও বারবার শাসকশ্রেণি নির্বাচনের ফলাফলকে বানচাল করার চেষ্টা করেছে। তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সুন্দরভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলনকে একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও মুক্তির আন্দোলন হিসেবে জনগণের সামনে তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন:
‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।... নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে, আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করব এবং এই দেশকে আমরা গড়ে তুলব, এ দেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে।...আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।’

অনেক সময়ই যাঁরা বড়মাপের নেতা হন, তাঁরা জনগণের সঙ্গে তেমন সম্পৃক্ত হন না। তাঁরা জনগণকে কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে পরিচালনার কথা বলেন। তাঁরা অনেক সময় থেকে যান জনগণের ঊর্ধ্বে। বঙ্গবন্ধু এর ব্যতিক্রম। তিনি সব সময় বাংলাদেশের জনসাধারণের সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখতেন। এবং তাই তিনি বারবার একদিকে তাঁর জনগণের জন্য ভালোবাসা এবং অন্যদিকে জনগণের তাঁর জন্য ভালোবাসার কথা উল্লেখ করতেন।

পৃথিবীর বিভিন্ন নেতার ভাষণ আমি যখন পড়ি এবং তাঁদের ভাষণের সঙ্গে যখন আমি বঙ্গবন্ধুর ভাষণের তুলনা করি, তখন আমার কাছে তাঁর একটি অভিব্যক্তি, ‘জনগণের প্রতি ভালোবাসা’, তা অনন্য বলে মনে হয়েছে। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের জন্য তাঁর যে ভালোবাসা এবং প্রতিদানে জনগণের যে ভালোবাসা তিনি পেয়েছেন, তার কথা তিনি নানা ভাষণে বারবার ব্যক্ত করেছেন।

বঙ্গবন্ধু জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, সমাজতন্ত্র—এসব নানা রকমের আদর্শের কথা বলতেন, তবে সাধারণ মানুষের দুঃখ–কষ্টে তাদের পাশে দাঁড়ানো, জনসাধারণ কোন কোন ইস্যুকে প্রাধান্য দিচ্ছে তার দিকেও তাঁর দৃষ্টি ছিল। জনসাধারণের ইস্যু নিয়েই তিনি কথা বলতেন, রাজনীতি করতেন। আমরা দেখতে পাই যখন তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, তখন তিনি দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য লঙ্গরখানা খুলে কাজ করেছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর যখন দেশে খাদ্যের অভাব, তখন তিনি সুষম খাদ্যবণ্টনের আন্দোলন, ভুখা মানুষের মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। তিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে কাজ করেন। দাঙ্গাকবলিত মানুষকে উদ্ধারের জন্য কাজ করেন। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্রিক ছিল না, সাধারণ মানুষের সমস্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা গড়ে তুলেছিলেন।

তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই দেশে বন্যা কিংবা খাদ্যাভাব অথবা দ্রব্যমূল্য বা কর বৃদ্ধি হলে তাঁর কত দুশ্চিন্তা হতো। জনসাধারণের ওপর যেসব ইস্যু প্রভাব ফেলে, তার সবই তার রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার মধ্যে ছিল। যেমন ‘কারাগারের রোজনামচা’য় তিনি লিখছেন:
‘খবরের কাগজ এসেছে...সিলেটের বন্যায় দেড় লক্ষ লোক গৃহহীন, ১০ জন মারা গেছে। কত যে গবাদিপশু ভাসাইয়া নিয়া গেছে তার কি কোনো সীমা আছে। কি করে এ দেশের লোক বাঁচবে তা ভাবতেও পারি না।...কত কর মানুষ দিবে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী শোয়েব সাহেব বলেছেন জনসাধারণ অধিকতর সচ্ছল হইয়াছে তাই কর ধার্য করেছেন। তিনি যাদের মুখপাত্র এবং যাদের স্বার্থে কাজ করেছেন তারা সচ্ছল হয়েছে। তাদের করের বোঝা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। শিল্পপতি ও বড় ব্যবসায়ীরা আনন্দিতই শুধু হন নাই, প্রকাশ্যে মন্ত্রীকে মোবারকবাদ দিয়ে চলেছেন। আর জনগণ এই গণবিরোধী বাজেট যে গরিব মারার বাজেট বলে চিৎকার করতে শুরু করেছে।’

যারা সমাজে অনাদৃত ও বঞ্চিত, তাদের প্রতি তার বিশেষ সহমর্মিতা ছিল। ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইটিতে তিনি বিভিন্ন কয়েদির জীবনবৃত্তান্ত, দুঃখ–কষ্ট বর্ণনা করেছেন। বিশেষ করে পাগল কয়েদিদের প্রতি তাঁর মমতাবোধ আমরা লক্ষ করি। জেলের কর্মচারীদের সঙ্গেও তাঁর সম্প্রীতি গড়ে ওঠে। তিনি জেলে নিজ হাতে রান্না করেছেন, বাগান করেছেন এবং তার সঙ্গে ডায়েরিও লিখেছেন। আওয়ামী লীগের অগণিত কর্মীর ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখেরও তিনি খবর রাখতেন। তাঁর দুটি বইয়েই আমরা তাঁর বহু সহকর্মীর এবং আওয়ামী লীগের নাম জানা-অজানা বহু কর্মীর ত্যাগ–তিতিক্ষার বর্ণনা পাই।

বঙ্গবন্ধু একদিকে ছিলেন সাধারণ মানুষের লোক, মানুষের কাছ থেকে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা তিনি জেনেছেন, শিখেছেন। অন্যদিকে তিনি ছিলেন জনতার নেতা। সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকেই তিনি সামনের দিকে, প্রগতির দিকে নিতে চেয়েছেন। সব বিষয়ে তিনি শেষ ভরসা করতেন মানুষের ওপরে। তাই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি জনগণকে আহ্বান করেন, বলেন ‘যার যা আছে তাই নিয়ে’ স্বাধীনতাসংগ্রামে যুক্ত হওয়ার জন্য। জাগ্রত জনতার ওপর তাঁর বিশ্বাস ছিল বলেই তিনি সেদিন বলতে পেরেছিলেন, ‘সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবা না।...রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ।’

যদিও বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে সুসংহত করেছিলেন, কিন্তু তিনি কখনো বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টি ও সংঘাতের রাজনীতি করেননি। বহু জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এক জাতিকে অন্য জাতির বিরুদ্ধে সহিংস আচরণের দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শোষকদের হাত থেকে বাঙালির মুক্তি কামনার লক্ষ্যে কাজ করেছেন। বাঙালিকে অন্য কোনো জাতির বিরুদ্ধে সহিংস আচরণে প্ররোচনা দেননি। সম্প্রতি আমরা পশ্চিমের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান দেখছি, যেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে তিক্ততা এবং সংখ্যাগুরুদের সংখ্যালঘুদের প্রতি অসহিষ্ণু মনোভাব লক্ষ করছি। বঙ্গবন্ধুর জাতীয়তাবাদের চিন্তা ছিল এর বিপরীত। তিনি সব গোষ্ঠীর সহাবস্থান এবং সব নাগরিকের সমান অধিকারে বিশ্বাস করতেন। তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি নিজেকে একাধারে বাঙালি এবং মানুষ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি কোনো অমানবিক কাজের সমর্থন কখনো করেননি। তিনি সব সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম থেকেই আমরা দেখি তাঁকে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট কলকাতার প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ও কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তিনি। সোহরাওয়ার্দী তাঁদেরকে এই দিবসটি শান্তিপূর্ণভাবে পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন সোহরাওয়ার্দী সরকারকে কেউই দোষারোপ করতে না পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে কলকাতায় এবং পরে নোয়াখালীতে। কলকাতায় তিনি হিন্দু, মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের লোককেই দাঙ্গা দেখে উদ্ধার করার চেষ্টা করেন। এরপর যখন মহাত্মা গান্ধীর সাথে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার জন্য সোহরাওয়ার্দী যুক্ত হয়েছিলেন, তখন বঙ্গবন্ধুও সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সেই প্রচেষ্টায় যুক্ত হন।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর বঙ্গবন্ধু যখন কলকাতা থেকে চলে আসেন, তখন সোহরাওয়ার্দী তাঁকে বলেন তিনি যেন পূর্ববঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য কাজ করেন, যাতে হিন্দুরা পূর্ববঙ্গ ত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসতে বাধ্য না হয়। সোহরাওয়ার্দী তাঁকে বলেছিলেন:
‘চেষ্টা করো যাতে হিন্দুরা চলে না আসে। ওরা এদিকে এলেই গোলমাল করবে, তাতে মুসলমানরা বাধ্য হয়ে পূর্ব বাংলায় ছুটবে। যদি পশ্চিম বাংলা, বিহার ও আসামের মুসলমান একবার পূর্ব বাংলার দিকে রওনা হয়, তবে...এত লোকের জায়গাটা তোমরা কোথায় দিবা...’

ঢাকায় ফিরে এসে গণতান্ত্রিক যুবলীগে যোগ দিয়ে তিনি সাম্প্রদায়িক মিলনকে একমাত্র কর্মসূচি হিসেবে নেওয়ার ওপর জোর দেন। পূর্ব বাংলায় যাতে দাঙ্গা না হয়, তার জন্য তিনি সব সময়ই সতর্ক ছিলেন। দাঙ্গা বলতে যে শুধু হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা তাই নয়, সব রকমের দাঙ্গারই তিনি বিরোধী ছিলেন। তাঁর আত্মজীবনীতে লাহোরে ১৯৫৩ সালের কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার তিনি নিন্দা করেছেন। ধর্ম নিয়ে রাজনীতির বিপক্ষে ছিলেন তিনি। ১৯৫৪ সালে নারায়ণগঞ্জের আদমজী পাটকলে বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গা যাতে বিস্তৃতি লাভ না করে, তার জন্য তিনি কাজ করেন। ১৯৬৪ সালে ভারতে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার পর তিনি সারা বাংলাদেশে দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠন করেন এবং ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ শিরোনামে প্রচারপত্র প্রকাশ করেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণেও তিনি জনগণকে সতর্ক করে বলেন:
‘মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটপাট করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-অবাঙালি যাঁরা আছেন, তাঁরা আমাদের ভাই, তাঁদের রক্ষার দায়িত্ব আমাদের ওপরে, আমাদের যেন বদনাম না হয়।’ 

ব্যক্তিগত জীবনে বঙ্গবন্ধু নামাজ পড়তেন, রোজা রাখতেন, কোরআন শরিফ পড়তেন। তিনি সব নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন। তবে তিনি রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের বিরোধী ছিলেন।

তাঁর আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখছেন:
‘আমি নিজে কমিউনিস্ট নই, তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসাবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যত দিন দুনিয়ায় থাকবে, তত দিন দুনিয়ার মানুষের উপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না।’  
সমাজতন্ত্র বলতে তিনি প্রাধানত শোষণমুক্ত এবং বৈষম্যহীন একটা ব্যবস্থার কথা ভাবতেন। ১৯৫২ সালে চীন যাবার পর চীন এবং পাকিস্তানের মধ্যে যে পার্থক্য তিনি দেখেছেন, তা তাঁর মনে গভীর দাগ কেটেছে। এই দুই দেশের পার্থক্য সম্বন্ধে তিনি লিখছেন:
‘তাদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য হল তাদের জনগণ জানতে পারল ও অনুভব করতে পারল এই দেশ ও এ দেশের সম্পদ তাদের। আর আমাদের জনগণ বুঝতে আরম্ভ করল, জাতীয় সম্পদ বিশেষ গোষ্ঠীর আর তারা যেন কেউই নন।’

শোষণমুক্তি এবং বৈষম্য দূরীকরণে সরকারের যে দায়িত্ব আছে, তা তিনি বিশ্বাস করতেন। চীনে গিয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন চীন সরকার জনসাধারণের জন্য কী কী কাজ করছে, সে দেশে প্রাধান্য পাচ্ছে শিল্পকারখানার উন্নতি, শৌখিন দ্রব্য নয়।
তিনি লিখছেন:
‘ভূমিহীন কৃষক জমির মালিক হয়েছে। আজ চীন দেশ কৃষক–মজুরের দেশ। শোষক শ্রেণি শেষ হয়ে গেছে।’ 
‘নতুন নতুন স্কুল, কলেজ গড়ে উঠেছে চারিদিকে। ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ভার সরকার নিয়েছে।’ 
রওনক জাহান: সম্মানীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)