ঢাকা রবিবার, ৬ই এপ্রিল ২০২৫, ২৪শে চৈত্র ১৪৩১


তাদের কী অপরাধ ছিল?


৫ এপ্রিল ২০২৫ ১৯:৫০

সংগৃহীত

অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক স্থান, বিশেষ করে বেসামরিক মানুষের জন্য। ইসরাইলি বাহিনীর অব্যাহত আগ্রাসনে সেখানে ঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন প্রথম সাড়া দেওয়া উদ্ধারকর্মী ও প্যারামেডিকরা। তারা ইসরাইলি বোমাবর্ষণে ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে আহতদের উদ্ধার করতে ছুটে গিয়ে নিজেরাই মৃত্যুর শিকার হন ।

 

গত সপ্তাহান্তে রাফার বাইরে দেবরিসে একটি বুলডোজারে খোঁড়া গর্তে পাওয়া গেছে ১৫ জন প্যারামেডিক ও রেড ক্রিসেন্টের উদ্ধারকর্মীদের লাশ। তারা সবাই ২৩ মার্চ ভোরে দায়িত্ব পালনকালে নিখোঁজ হন।

 

তাদেরই একজন সালেহ মোআমের নামে ৪৫ বছর বয়সি এক রেড ক্রিসেন্টের অ্যাম্বুলেন্স কর্মকর্তা। তিনি এর আগেও দুবার মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসেন। একবার রোগী পরিবহনের সময় ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে তার গাড়ির চালক নিহত হন। এ সময় একটি গুলি তার নিজের বুকেও আঘাত হানে। 

 

সালেহ সেদিন নিজের শরীরে প্রাথমিক চিকিৎসা করে গাড়ি চালিয়ে নিরাপদে ফিরতে সক্ষম হন। পরে তিন মাস হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে আবার কাজে ফেরেন।

 

তার পরিবারের সদস্যরা জানান, ‘তিনি সবসময় বলতেন, যার যা ভাগ্য, তা হবেই’। 

 

নিজের শেষ ডিউটিতে যাওয়ার আগের রাতে তিনি তার স্ত্রী, ছয় সন্তান এবং ভাইয়ের সন্তানদের জন্য বাড়ির প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে আনেন। যেন বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি আর ফিরবেন না।

 

রেড ক্রিসেন্ট জানায়, ইসরাইলি হামলায় তাদের ৮ জন প্যারামেডিক নিহত হয়েছেন। ওই সময় তারা ‘হাশাশিন’ নামক একটি এলাকায় উদ্ধার মিশনে গিয়েছিলেন। 

 

মুন্থের আবেদ নামে ঘটনাস্থলে থাকা আরেক প্যারামেডিক জানান, তারা ইসরাইলি বিশেষ বাহিনীর হাতে আটক হন এবং পরে দেখতে পান যে, ইসরাইলি সেনারা একটি গর্ত খুঁড়ে অ্যাম্বুলেন্স ও লাশগুলো মাটিচাপা দিচ্ছে।

 

এদিকে নিখোঁজ রেড ক্রিসেন্ট কর্মীদের পরিবার এক সপ্তাহ ধরে দুশ্চিন্তায় দিন পার করেন। পরে খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে লাশগুলো এসে পৌঁছালে সালেহর ভাই বিলাল গিয়ে নিজের ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করেন। এ সময় তার হাতে শক্ত রশি জাতীয় কিছু দিয়ে বাঁধার দাগ ও আঙুল ভাঙা ছিল।

 

তবে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর দাবি, তারা ‘সন্দেহজনকভাবে’ এগিয়ে আসা কিছু যানবাহনে গুলি চালিয়েছিলেন। তারা সন্দেহ করেন যে, হামাস যোদ্ধারাই এসব অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করছিল। যদিও তারা এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি।

 

বিলাল বলেন, ‘এই প্যারামেডিকরা মানবিক সেবা দিচ্ছিল। তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের অস্ত্রই ছিল না। তাদের অপরাধটা কী ছিল যে, এভাবে হত্যা করা হলো?’

 

আরেক নিহত প্যারামেডিক মোহাম্মদ বাহলুলের বাবা ৬৩ বছর বয়সি সোভি বলেন, ‘আমি তার মুখের সামনে গিয়ে দাঁড়াই, তারপর নিশ্চিত হই যে, এটাই আমার ছেলে। তার শরীরে একাধিক গুলির চিহ্ন ছিল। বিশেষ করে বুক ও হৃদযন্ত্রের আশেপাশে। মনে হয়, সে হাত তুলে আত্মসমর্পণ করতে গিয়েছিল। কিন্তু ইসরাইলি বাহিনী তাকে গুলি করে মেরেছে। গুলি তার হাত ভেদ করে শরীরে ঢুকে গেছে’।

 

শহিদ হওয়া মোহাম্মদ বাহলুল নার্সিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছিলেন। পরে প্যারামেডিক প্রশিক্ষণ নেন এবং স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ২০১৮ সাল থেকে কাজ করছিলেন।

 

তার বাবা আরও বলেন, ‘সে ছিল সাহসী, অন্যদের বাঁচাতে সর্বদা সজাগ। আমরা কখনো ভাবিনি যে, এমন কিছু আমাদের জীবনে ঘটবে। তারা জীবন বাঁচাতে গিয়েছিল, অথচ নিজেরাই প্রাণ হারাল’।