ঢাকা বুধবার, ২২শে মে ২০১৯, ৯ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬


৩৭ তম নেতৃত্ব বরণে প্রস্তুত ডাকসু


১৪ মার্চ ২০১৯ ১৮:৪২

আপডেট:
২২ মে ২০১৯ ১৫:০৪

ছবি সংগৃহিত

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হয়ে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সূতিকাগার এই বিশ্ববিদ্যালয়টি। বাংলাদেশের সকল আন্দোলনের সূত্রপাত হয় এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ২৮ বছর পর গত ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

৩৭তম নির্বাচনে ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নূর, জিএস বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী এবং এজিএস ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন।

এই নির্বাচন নিয়ে কারচুপি আর অনিয়মের অভিযোগ উঠায় ছাত্রলীগ ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেয়া সব কয়টি প্যানেল নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। এমনকি নবনির্বাচিত ভিপিসহ ওই সব প্যানেল পুনর্নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করছে।

তবে এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ডাকসুর সভাপতি আখতারুজ্জামান স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন নতুন করে নির্বাচন সম্ভব নয়।

মধুর ক্যান্টিনের বিপরীত পাশে আজও গৌরবের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ডাকসু ভবন ও সংগ্রহশালা। ভিপি-জিএসসহ নতুন নেতৃত্বদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে ডাকসু। তাদের বরণে প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে ডাকসু ভবনের কক্ষগুলো। তবে কক্ষের সাজ-সজ্জার বিষয়টি আটকে আছে নেতাদের সিদ্ধান্তের উপর, কারণ তাদের পছন্দ অনুযায়ীই কক্ষগুলো সাজানো হবে।

নতুন ভিপি-জিএসের পছন্দেই সাজবে তাদের কক্ষ:
সরিজমিনে ডাকসু ভবনের দোতলায় গিয়ে দেখা যায়, আটটি কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে নতুন নেতাদের জন্য।দীর্ঘ এক যুগ ধরে ডাকসু ভবনের দেখভাল করছেন এখানকার স্টাফ আবুল কালাম আজাদ। তিনি জানান, নতুন নেতাদের জন্য ৮টি কক্ষ ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে রঙ করা হয়েছে। দেয়ালে কারুকাজ করানো হয়েছে। লাগানো হয়েছে নতুন ফ্যান ও প্রতিটি কক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা। তবে কক্ষগুলোর সাজসজ্জার কাজ বাকি রয়েছে, কারণ নেতাদের পছন্দ অনুযায়ীই কক্ষগুলো সাজানো হবে।

নতুন নেতাদের কক্ষে যা যা রয়েছে:
আবুল কালাম আজাদ ঘুরে ঘুরে এই প্রতিবেদক এবং সাংবাদিককে পুরো ডাকসু ভবন ঘুরিয়ে দেখান। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে বাম পাশের প্রথম কক্ষটিই ডাকসু সহ-সভাপতির (ভিপি), তারপরের কক্ষটি সাধারণ সম্পাদকের (জিএস)। পর্যায়ক্রমে বাকি ৬টি কক্ষ সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস), সাহিত্য সম্পাদক, সম্পাদক ও সদস্যবৃন্দ, খেলাধুলার কক্ষ, কনফারেন্স হল ও পত্রিকা পড়ার কক্ষ হিসেবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

নতুন তালা দিয়ে তালাবদ্ধ এসব কক্ষে রয়েছে চেয়ার, টেবিল, বইয়ের আলমারি, সোফাসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র। খেলাধুলার কক্ষে রয়েছে খেলার যাবতীয় সামগ্রী। পত্রিকার কক্ষে রয়েছে পুরোনো পত্রিকার আর্কাইভ ও বিভিন্ন বই।

ডাকসু সংগ্রহশালা:
ডাকসু ভবনের নিচতলায় রয়েছে ডাকসু সংগ্রহশালা। বাংলাদেশের সামগ্রিক ইতিহাসের স্থিরচিত্র সংরক্ষণ করা হয়েছে এই সংগ্রহশালায়। সংগ্রহশালাটিতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসবেষ্টিত বিভিন্ন ছবি ছাড়াও বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের ছবি, লেখা, খবরের কাগজের কালেকশন, স্থিরচিত্র ও ভাস্কর্য রয়েছে, যেগুলো তৎকালিন পুরো পূর্ব বাংলাকে আমাদের চোখের সামনে হাজির করে।

ডাকসু সংগ্রহশালায় প্রবেশ করে বরাবর সামনে তাকালে দেখা যাবে সেই ঐতিহাসিক আমতলা। যেখানে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রতিবাদী ছাত্র সভা হয়েছিল। এখান থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সংরক্ষিত ছবি, যারা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দুইদিন আগে ১৪ ডিসেম্বর রাজাকারদের সহায়তায় পাকহানাদারদের হাতে শহীদ হন।

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ২১ শে ফেব্রুয়ারি ছাত্র জনতার উপরে পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে সেখানে মারা যান অনেক ছাত্রজনতা। তাদেরই স্মৃতি রক্ষার্থে সেদিন রাতেই ১০ ফুট উঁচু এবং ৬ ফুট চওড়া দেশের প্রথম শহীদ মিনার স্থাপন করা হয়। ২২ শে ফেব্রুয়ারি শহীদ শফিউরের পিতা তা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। সেই শহীদ মিনারটির ছবি রয়েছে ডাকসু সংগ্রহ শালায়।

এছাড়া রয়েছে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর আঙ্গুল উঁচিয়ে দেয়া ভাষণের ভাস্কর্য। বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বিভিন্ন দেশের প্রাচীন মুদ্রাও রাখা হয়েছে সংগ্রহশালায়।

ডাকসুর ইতিহাস:
১৯২২ সালের ১লা ডিসেম্বর কার্জন হলে অনুষ্ঠিত শিক্ষকদের একটি সভায় ১৯২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ' নামে একটি ছাত্র সংসদ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯২৩ সালের ১৯শে জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন নির্বাহী পরিষদ পূর্বোল্লিখিত শিক্ষক সভার সিদ্ধান্তকে অনুমোদন দেয়। ১৯২৫ সালের ৩০ অক্টোবর সংসদের সাধারণ সভায় খসড়া গঠনতন্ত্র অনুমোদন করা হয়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী পরিষদ অনুমোদন করলে তা কার্যকর হয়। প্রথমবার ১৯২৪-২৫ সালে সম্পাদক ছিলেন যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, পরের বছর অবনীভূষণ রুদ্র। ১৯২৯-৩০ সালে সম্পাদক নির্বাচিত হন আতাউর রহমান খান।

পরবর্তীতে ১৯৫৩-৫৪ শিক্ষাবর্ষে গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে পূর্বনাম পরিবর্তন করে বর্তমান নাম 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ' গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ডাকসুর সহসভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন থেকে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন মাহবুবুর জামান।

১৯৭৩ সালের নির্বাচন ভণ্ডল হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭৯, ১৯৮০ ও ১৯৮২ সালে ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল। প্রথম ২ নির্বাচনে যথাক্রমে জাসদ-ছাত্রলীগের এবং বাসদ-ছাত্রলীগের প্রার্থী হয়ে সহ-সভাপতি (ভিপি) ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে জিতেছিলেন মাহমুদুর রহমান মান্না ও আখতারুজ্জামান।

১৯৮২ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ১৯৮৯ পর্যন্ত ভিপি ও জিএস পদে যথাক্রমে দায়িত্ব পালন করেন আখতারুজ্জামান ও জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। ১৯৮৯-৯০ সেশনে দায়িত্ব পালন করেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ এবং মুশতাক আহমেদ।

১৯৯০ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ১৯৯০-৯১ সেশনের জন্য ভিপি ও জিএস পদে যথাক্রমে নির্বাচিত হন ছাত্রদলের আমানউল্লাহ আমান ও খায়রুল কবির খোকন। এরপর দীর্ঘ ২৮ বছর ডাকসু নির্বাচন হয়নি।
সবশেষ গত ১১ মার্চ ৩৭ তম ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

নতুনসময় / আইআর