কক্সবাজারে হাঁটাচলাও কঠিন, বেড়েছে সব কিছুর খরচ

ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটিতে পর্যটকদের ঢল নেমেছে কক্সবাজারে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে বাস, ট্রেন ও বিমানে করে লাখো মানুষ ছুটে এসেছেন বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের টানে। বুধবার সকাল থেকেই শহরে পর্যটকদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও গেস্ট হাউস পর্যটকে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে।
দুপুর ও বিকালে সৈকতের কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্টে এতটাই উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে যে, হাঁটাচলাও কঠিন হয়ে পড়েছে। সমুদ্রের নীল জলরাশি, বালুকাবেলার শীতল স্পর্শ ও ঢেউয়ের গর্জন উপভোগ করতে সকাল থেকেই দলে দলে পর্যটকরা সৈকতে নেমেছেন। কেউ সাগরের নোনা জলে গা ভিজিয়েছেন, কেউবা উন্মুক্ত সৈকতে ঘুরে বেড়িয়ে কাটিয়েছেন অবসর সময়।
সকালেই হোটেল-রিসোর্টে পৌঁছে পর্যটকেরা স্বল্প বিশ্রাম নিয়েই ছুটে যান সমুদ্র সৈকতে। দুপুরের মধ্যেই কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে সৃষ্টি হয় জনস্রোত। সৈকতের প্রতিটি অংশ পর্যটকের কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে। রোদ-গরম উপেক্ষা করেও হাজারো মানুষ সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগে মগ্ন ছিলেন। সবাই যেন শহরের ব্যস্ত জীবনের গ্লানি ভুলে সমুদ্রের বিশালতার মাঝে হারিয়ে যেতে এসেছেন।
সমুদ্রে গোসল সেরে হাজারও পর্যটক ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, টমটম, অটোরিকশা কিংবা খোলা জিপগাড়িতে চড়ে ছুটে যাচ্ছেন ৮০ কিলোমিটারের কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের দিকে। মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে আছে দরিয়ানগর পর্যটনপল্লি, আকাশে ওড়ার প্যারাসেইলিং, হিমছড়ি ঝরনা, পাথুরে সৈকত ইনানী ও পাটোয়ারটেক এবং সর্বশেষ প্রান্তে টেকনাফ জিরো পয়েন্ট সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক।
তবে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমনের সুযোগ নিয়ে হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ ও যানবাহনের ভাড়া অতিরিক্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঢাকার মিরপুর থেকে আসা গার্মেন্টস ব্যবসায়ী রমজান আলী বলেন, গত ডিসেম্বরে যে হোটেলের কক্ষ ভাড়া ছিল সাড়ে ৩ হাজার টাকা, এবার অগ্রিম বুকিং দিয়েও সাড়ে ৬ হাজার টাকা গুনতে হয়েছে। রেস্তোরাঁয়ও খাবারের দাম অনেক বেশি।
একই অভিযোগ করেছেন সিলেট থেকে আসা পর্যটক দম্পতি বাপ্পি চৌধুরী ও সারিকা হোসেন। তারা বলেন, কক্সবাজারের প্রকৃতি মুগ্ধকর হলেও অতিরিক্ত খরচ আমাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হোটেল খাবার সবকিছুর দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। প্রশাসনের বিষয়টি নজরে আনা উচিত।
কক্সবাজার আবাসিক হোটেল-মোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, কক্সবাজার শহরের আবাসিক হোটেল, গেস্ট হাউস ও রিসোর্টের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ শতাধিক। এসব আবাসনে গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি পর্যটক থাকতে পারেন। বুধবার এসব আবাসনের কোনো কক্ষই খালি ছিল না। আগামী ৫ এপ্রিল পর্যন্ত পর্যটকরা হোটেল বুকিং করে রেখেছেন।
পর্যটকদের চাপ বেশি থাকলে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেন- এ কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, আমরা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করেছি। হোটেল মালিকদের বলা হয়েছে, যেন প্রতিটি হোটেলে কক্ষভাড়ার তালিকা টাঙানো থাকে। পর্যটকরা তালিকা দেখে কক্ষ ভাড়া পরিশোধ করবেন। কেউ এ নির্দেশনা না মানলে প্রশাসন তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারবে।
কক্সবাজার কলাতলী হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান জানান, বাড়তি ভাড়া যাতে আদায় করা না হয় সেজন্য প্রশাসনের পাশাপাশি নিজেরা তদারকি করছে। আগামী এক সপ্তাহে পর্যটকের এ ঢল থাকবে বলে আশা মুকিম খানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় কাজ করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ ও লাইফগার্ড সদস্যরা। সি-সেইফ লাইফগার্ডের সুপারভাইজার ওসমান গনি জানান, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রায় লাখখানেক পর্যটক সৈকতে এসেছেন, তাদের অধিকাংশই সমুদ্রে নেমে স্নান করেছেন। আমরা সব সময় তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছি।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) জসিম উদ্দিন চৌধুরী জানান, পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে। চুরি-ছিনতাই রোধে অভিযান চালানো হচ্ছে। যানজট নিরসনেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ বলেন, আমরা ধারণা করছি বর্তমানে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। আমরা পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পর্যটন স্পটগুলোতে বাড়িত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছি। পাশাপাশি র্যাব, জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা লোকজনও মাঠে কাজ করে যাচ্ছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ সালাহউদ্দিন জানান, ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত হোটেল ভাড়া ও খাবারের মূল্য নেওয়া হচ্ছে কিনা, তা তদারকি করতে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে কাজ করছে। অভিযোগের সত্যতা মিললে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।