ঢাকা বুধবার, ১৯শে ডিসেম্বর ২০১৮, ৫ই পৌষ ১৪২৫

সোনারগাঁয়ের সেকাল-একাল


৩১ আগস্ট ২০১৮ ১৪:০০

আপডেট:
৩১ আগস্ট ২০১৮ ১৪:০০

পৃথিবীর ১০০টি ধ্বংসপ্রায় ঐতিহাসিক শহরের একটি পানাম নগর যা নারায়ণঞ্জ জেলার সোনারগাঁয়ে অবস্থিত। বাংলার প্রাচীনতম শহর পানাম। এখানে এক সময় ধনী হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস ছিল। ছিল পৃথিবীখ্যাত মসলিন কাপরের জমজমাট ব্যবসা। সংস্কারহীন কিছু বিধ্বস্ত প্রাচীন ভবন ছাড়া সেই নগরীতে অবশিষ্ট আর কিছুই নেই।

এখন ঘুরেতে আসা দর্শনার্থীরা শুধু ঐতিহাসিক পুরনো বাড়িগুলোই দেখতে পান। ২০০৬ সালে পানাম নগরকে প্রকাশ করা হয় বিশ্বের ধ্বংসপ্রায় ১০০টি ঐতিহাসিক স্থাপনার তালিকায়। ঈসা খাঁ এর আমলের বাংলার রাজধানী পানাম নগর। বড় নগর, খাস নগর, পানাম নগর প্রাচীন সোনারগাঁর এই তিন নগরের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিলো পানাম। কয়েক শতাব্দীর পুরনো অনেক ভবন রয়েছে এখানে। বাংলার বার ভূঁইয়াদের ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত এসব ভবন।

ঢাকা থেকে ২৭ কি.মি. দক্ষিণ-পূর্বে নারায়ণগঞ্জের সন্নিকটে সোনারগাঁয় এই নগর অবস্থিত। সোনারগাঁয়ের প্রায় ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রাচীন এ নগরী গড়ে ওঠে। ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূণ একটি শহর পানাম। ইতিহাস বলে, ১৪০০ শতাব্দীতে এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যেখানে পৃথিবীর নামি-দামি শিক্ষকরা পড়াতে আসতেন। জানা যায় এখানে একটি ভৃত্য বাজারও ছিল।

ঔপনিবেশিক আমলের মোট ৫২টি স্থাপনা রয়েছে পানাম নগরীর দুই পাশে। এর উত্তরদিকে ৩১টি এবং দক্ষিণদিকে ২১টি ইমারত স্থাপিত। ইউরোপীয় শিল্পরীতির সাথে মোঘল শিল্পরীতির মিশ্রণ লক্ষ্য করা যায় স্থাপনাগুলোর স্থাপত্যে। পানাম নগরী নির্মাণ করা হয়েছিল নিখুঁত নকশার মাধ্যমে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে কূপসহ আবাস উপযোগী নিদর্শন। পানি সরবরাহের জন্য নগরীর দু’পাশে খাল ও পুকুরের অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। যা ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত।

এখানে আবাসিক ভবন ছাড়াও রয়েছে উপাসনালয়, গোসলখানা, পান্থশালা, দরবার কক্ষ ইত্যাদি। পানাম নগরের আশে পাশে ছোট সর্দার বাড়ি, ঈশা খাঁর তোরণ, নীলকুঠি, বণিক বসতি, ঠাকুরবাড়ী, পানাম নগর সেতুসহ আরো কিছু স্থাপনা আছে। নগরের ভবনগুলোর সিংগভাগ লাল ইটের তৈরী। মসৃণ পিচঢালা পথের দু’পাশে শ্রেণীবিন্নাস করা বাড়ি আসলেই মনমুগ্ধকর।

এখানে রয়েছে ১৫০ বিঘা আয়োতনের সুবিশাল একটি কমপ্লেক্স। কমপ্লেক্সটি লুপ্তপ্রায় রাজধানীতে টিকে থাকা পানাম নগরের কথা বলছে। এখানে লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের বিশাল চত্বরে বেশ কয়েকটি পিকনিক স্পট রয়েছে। বিশেষ করে শীতকালে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার দর্শনার্থী এসব পিকনিক স্পটে ভ্রমণে আসে। এখানকার কারুশিল্প গ্রামে রয়েছে বৈচিত্র্যময় লোকজ স্থাপত্য গঠনে বিভিন্ন ঘরে কারুশিল্প উৎপাদন, প্রদর্শন ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা। দোচালা, চৌচালা ও উপজাতীয় মোটিফে তৈরি এ ঘরগুলোয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অজানা, অচেনা, আর্থিকভাবে অবহেলিত অথচ দক্ষ কারুশিল্পীরা বাঁশ-বেত, কাঠ খোদাই, মাটি, জামদানি, নকশিকাঁথা, একতারা, পাট, শঙ্খ, মৃৎশিল্প ও ঝিনুকের সামগ্রী ইত্যাদি কারুশিল্প উৎপাদন, প্রদর্শনী ও বিক্রি হচ্ছে।

এছাড়া জাদুঘর অভ্যন্তরে রয়েছে পিকনিক স্পট, স্থাপত্য নকশা অনুযায়ী নির্মিত আঁকাবাঁকা মনোরম লেক। আরও আছে পানাম ব্রীজ, নীলকুঠী, গোয়ালদী শাহী মসজিদসহ অনেক পীর-ওলীদের মাজার। সোনারগাঁ লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর থেকে উত্তর দিকে হাঁটলেই সহজে পৌঁছানো যাবে অর্ধ্বচন্দ্রাকৃতি পানাম পুলে। (যদিও পুলটি ধ্বংস হয়ে গেছে)।

এই পুল পেরিয়েই পানাম নগর এবং নগরী চিরে চলে যাওয়া পানাম সড়ক। আর সড়কের দু’পাশে সারিসারি আবাসিক একতলা ও দ্বিতল বাড়িতে ভরপুর পানাম নগর। প্রাচীন রাজধানী সোনারগাঁয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা নিতে চাইলে যে কেউ পারবেন খুব অল্প সময়ের মধ্যে। নদী-নালা, খাল-বিল পরিবেষ্টিত এবং অসংখ্য গাছপালা সবুজের সমারোহ সহজেই আকৃষ্ট করে।

ঈশাখাঁর বাড়িটি অসাধারণ স্থাপত্যশীল আর মধ্যযুগে পানাম নগরী কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভুলিয়ে দেয় ব্যস্ততা, দুঃখ, আর গ্লানিকে। লিচুর দিন শেষ। তবে কোনো এক গ্রীষ্ম এখানে গেলে পাওয়া যাবে গ্রীষ্মের মধুফল কদমী লিচু।