ঢাকা বুধবার, ১৯শে ডিসেম্বর ২০১৮, ৫ই পৌষ ১৪২৫

নিঃশর্ত ক্ষমা চাই বাবা


২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ১২:০০

আপডেট:
২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ১২:৩৫

জন্মের পরে যখন বাবা-মা বুঝতে শিখেছি তখন দেখেছি আমার মন খারাপ বা কান্না তোমাকে কতটা চিন্তিত করে তুলেছে। আমার প্রতিটা মুহূর্ত নির্বিঘ্নে কাটাতে কোন আয়োজনের ঘাটতি রাখনি তুমি। অফিস থেকে কয়েক মাইল হেঁটে আসতে তোমার মধ্যে কোন ক্লান্তি দেখিনি। কোন কষ্টও হয়নি তোমার। তবে ১০-১৫ টাকা রিক্সা ভাড়া দিতে তোমার খুব কষ্ট হত।

তাহলে কি এভাবে নিত্যদিন হেঁটে আসতে তোমার ভালো লাগতো? এ প্রশ্নের উত্তর ইদানিং অনেক খুঁজেছি। হা ভালো লাগতো না তোমার। খুব কষ্ট হত তোমার। বড্ড ক্লান্তি ভর করত তোমার দেহে। কিন্তু সেটা তুমি আমাকে বুঝতে দেওনি। এত কষ্টের মাঝেও কিন্তু তুমি কোনদিন আমার জন্য মজা আনতে ভুলনি বাবা। হয়তো এই ভুলটা করতেই শিখনি তুমি।

বাবা তোমার মনে আছে? আমাকে পিঠে বসিয়ে এক রুম থেকে অন্য রুমে ক্লান্তহীনভাবে ঘোড়ায় চড়াতে। তুমি ভুলে গেছ? কাঁধে করে আমায় বাজারে নেওয়ার কথা। গনেশের দোকানের মিষ্টি আর দইয়ের কথাও কি মনে নেই তোমার? ওই যে গনেশের দোকানে আমি মিষ্টি ও দই খেতাম আর তুমি অপলকে তাঁকিয়ে থাকতে আমার দিকে। খুব মজা করে উপভোগ করতে আমার আনন্দ। কিছুই মনে পড়ছে না!! মনে পড়বে কিভাবে সেই মিষ্টি আর দইয়ের স্বাধতো তোমার জিহ্বা কোন দিন স্পর্ষ করেনি। ইস্ আমি বড্ড বোকা সেই স্বাধ গ্রহন করার ইচ্ছা শক্তিইতো ছিলনা তোমার। আমার স্বাধ গ্রহনেই তো তোমাকে দেখেছি তৃপ্ত।

বাবা মনে পড়ছে? আমার বয়স যখন ৩-৪ বছর তখন আমি পা-পিছলে রাস্তায় পরে ব্যাথা পেয়েছিলাম। সে ঘটনা তোমাকে কতই না উম্মাদ করে দিয়েছিল। রাতদিন আমার ক্ষত স্থানটা নিয়ে ছিল তোমার যত চিন্তা।

ঠিক এভাবেই তোমার আদর স্নেহে আমার মানব দেহটার আকৃতি দিন দিন বড় হতে লাগল। আস্তে আস্তে পাল্টে যেতে লাগল আমাদের সম্পর্ক। যখন আমি প্রথম স্কুলে ভর্তি হই সেদিনটা নিশ্চই তুমি ভুলনি। বলেছিলে আমাকে বেবি শ্রেনীতে ভর্তি করবা। আমি ভেবেছিলাম বাহন বেবিতে আমাকে ঘুড়ানো হবে। যখন দেখলাম কোন বাহন নেই পায়ে হেঁটে বাসার পাঁশের স্কুলে নেওয়া হল, সেকি কান্না আমার। আমার কান্না থামাতে কতই না কি করেছ তুমি।

এরপর থেকে তোমার আদরের রূপটা পাল্টে যেতে লাগল। যেই তুমি সারাদিন আমায় নিয়ে দুষ্টামি করতে, সে এখন আমায় পড়ার টেবিলে বসাচ্ছ। বিষয়টা কেমন যেন আমার কাছে ভালো লাগছিল না। আস্তে আস্তে তোমার শাসন-অনুশাসনের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে লাগল। আমার কাছে কেন যেন মনে হচ্ছিল তুমি বড্ড পঁচা হয়ে গেছ। তোমার উপর দিন দিন আমার অভিমানটা বৃদ্ধি পেতে লাগল। কিন্তু কোন অভিমানে কিছু হচ্ছিল না। আমার স্কুলে যাওয়া ও পড়ালেখার বিষয়ে তোমার নজরদারি চক্রবৃদ্ধি সুদের হারে বাড়তে লাগল।

মাঝেমাঝে তোমার পেছনে অনেক গালমন্দ করেছি। এমনকি যেই আমি কয়েক বছর আগেও তোমার অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলে কান্নায় পৃথিবী একাকার করে ফেলতাম। সেই আমি তোমার দেরিতে ফিরার জন্য রিতিমত প্রার্থনা শুরু করলাম। আসলে বাবা আমি বড্ড গাঁধা ছিলাম। একবারও বুঝতে পারিনি যে তুমি শুধু মাত্র আমার ভবিষ্যতে ভালো থাকার উপঢৌকন জোগার করতে এসব করছ। এর ভাগ যে তুমি পাবেনা সেটাও তুমি জানতে। কিন্তু পৃথিবীর এতসব লাভ-লসের হিসাবের গন্ডিতে বাস করেও আমার বেলায় কোন কার্পন্য করনি তুমি।

আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম তখন তুমি খুব আনন্দিত হয়েছ। সেটা তোমার মুখ-চোখ আমায় বুঝিয়ে দিয়েছে। এরপর থেকে আস্তে আস্তে আমি ব্যস্ত হয়ে পরলাম। পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে টিউশনি, সব মিলিয়ে মহাব্যস্ত আমি। দু’এক টাকা ইনকাম করতে শিখেছি। কিন্তু হিসাব চাওনি কখনো। যখন যা চেয়েছি তাই দিয়েছ। একবারের জন্য জানতে চাওনি টিউশনি করিস, সেই টাকা কি করিস?

বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম বর্ষ থেকেই তুমি পেনশনে। কিন্তু তোমার চেহারা কখনই আমাকে ভীত করেনি। কারন তোমার সকল কষ্টকে বুকে চাপা দিয়ে একরাশ গোলাপ শুভাষিত কৃত্রিম হাসি নিয়ে আমার সামনে আসতে। একটা বিষয় আজ বড় অবাক লাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত অবস্থায় কোনদিন প্রয়োজন ছাড়া তোমাকে ফোন দেইনি। তোমাকে ফোন করতাম যখন টাকা প্রয়োজন হত। তবুও কোনদিন রাগ করনি। নির্লজ্জের মত আমার খোঁজ নিয়ে গেছ। কোন রাগ অভিমান হয়নি তোমার।

আজ হঠাৎ তোমার নির্লোভ সব আচরনগুলো আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। খুব কান্না পায় আমার। যা তোমাকে দেখাতে পারিনা। তোমার কথা মনে পরে খুব আবেগপ্রবণ হয়ে যাই আমি। যা কল্পনা করা যায় না। আমার বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তোমার কালো চুলগুলো আজ সাদা হয়ে গেছে। আজ তোমার খোকা ২৩ পার করে ২৪ এ ছুই ছুই যুবক আর তুমি বয়সের ভারে বড্ড ক্লান্ত। কৃত্রিমতা দেখানোর মত শক্তিটুকোও তোমার মধ্যে বিদ্ধমান নেই। তবুও তুমি এখনো কৃত্রিম হাসির চেষ্টা কর। যা আমাকে খুব কষ্ট দেয়।

বাবা ছোটবেলা তোমার পিঠে উঠতাম, তুমি আমাকে বুকে ঝরিয়ে ধরে কি এক অদ্ভুদ আনন্দ পেতে তা আমার মাথায় ঘুরপাক খেত। আজ আমারো খুব ইচ্ছে করে তোমার দেহের স্পর্ষ পেতে। ইচ্ছে করে তোমার পাঁশে শুয়ে তোমার দেহকে স্পর্ষ করি। তুমি শুনলে অবাক হবে, আজ আমি যখন কোন জায়গায় টাকা খরচ করি তখন তোমার কথা ভেবে কষ্ট হয়। আমার ইচ্ছে হয় আমার সকল উপার্জন তোমার জন্য ব্যায় করি। সারা জীবন নিঃশ্বার্থ ভাবে আমাকে দিয়ে গেছ। বিনিময়ে কিছুই দিতে পারিনি তোমায়। বাবা কিছুদিন যাবত আমি খুব দুর্বল।

তোমার অসুস্থতা আমার মাঝে সুনামি বয়ে দিচ্ছে। বারবার তোমাকে হারানোর ভয় আমার মনকে অশান্ত করে তুলছে। আজ আর কিছুই ভালো লাগে না আমার। কর্মব্যস্ত সময়ে তোমাকে সময় দিতে পারিনা ঠিক। হয়তো তোমার সাথে ততটা কথাও বলা হয়না। তবে আমার মনটা পরে থাকে তোমার কাছে। খুব ইচ্ছা করে তোমাকে ঝড়িয়ে ধরে মন খুলে কান্না করি। খুব কথা বলি তোমার সাথে। কিন্তু সেই সাহস আমার নেই।

জানি আমার এ লেখা তোমার দৃষ্টিগোচর হবে না। হয়তো কোনদিন তোমাকে মনখুলে আবেগগুলো বলতেও পারব না। তবে তোমার মৃত্যুর পরে সারাজীবন তোমার বিয়োগ আমায় কাঁদাবে। আমার জন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ও একমাত্র আশ্রয়স্থল তুমি। তোমাকে ছাড়া আমার জীবন কল্পনাও করতে পারিনা বাবা। তোমার সততা, নিষ্ঠা, ধর্য্যশীলতা, ধর্মভিরুতা, মহানুভবতা এর কোনটাই আমার মধ্যে বিদ্ধবান নেই। তুমি হাজার লক্ষ গুনের অধিকারী। তুমি পৃথিবীর শেষ্ঠ বাবা। বড্ড ভালোবাসি তোমায়। তোমার মৃত্যু আমাকে নিঃশ্ব করে দিবে। ধংশ করে দিবে আমার সব ইচ্ছা শক্তি। আমি হারাব আমার একমাত্র আশ্রয়স্থল। তোমার জন্য কিছুই করতে পারিনি আমি। আমায় বরাবরের মত নিঃশর্ত ক্ষমা করে দিও বাবা।

হে সৃষ্টিকর্তা তোমার কাঁছে আমার বাবার সুস্থতার সহিত দীর্ঘ নেক হায়াৎ কামনা করি। মৃত্যু হয়না যেন তার আমার আগে।