ঢাকা সোমবার, ২১শে জানুয়ারী ২০১৯, ৯ই মাঘ ১৪২৫


সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ার পথেই বাংলাদেশ


৩ জানুয়ারী ২০১৯ ০২:১৯

আপডেট:
৩ জানুয়ারী ২০১৯ ১৩:১৪

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্র একটি দুই চাকার গাড়ী। এখন যেটা হচ্ছে, একটা বিরোধী দল কার্যত নেই। এখন একটা ভাইব্রেন্ট পার্লামেন্টের জন্য আমরা কী করতে পারি? এখন যারা সংসদ সদস্য হয়েছেন। তাদের দায় বেড়েছে। সরকারকেই বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে হবে। জাতীয় পার্টির মহাসচিব আজও সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি তারা কি সরকারে যাবে নাকি বিরোধী দলে যাবে।

অন্যদিকে, বিএনপির ৭জন যদি শপথ না নেয়। বিএনপির কি লাভ হবে? বিএনপি এখন বলছে ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেটাই সঠিক ছিল। কিন্তু এটা কোন কারণে হাতাশা জনক উক্তি বলেই বেশিরভাগ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তাহলে এখন উপায়টা কী?

মালয়েশিয়ার কথাই ধরা যাক। এই দেশটি ১৯৫৫ থেকে পরবর্তী প্রায় ৬১ বছর একমাত্র ‘বারিসান ন্যাশনালি’ দল দ্বারা পরিচালিত এবং শাসিত হয়েছে একটি দুর্বল বিরোধী দলের বা জোটের বিপরীতে। আধুনিক মালয়েশিয়ার প্রসঙ্গ এলেই চলে আসে মাহাথির মোহাম্মদের নাম। তার শাসনামলের গুনগান। তিনি ১৯৮১ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত একটানা ২৪ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন একটি দুর্বল জোটের বিরুদ্ধে। তার ফলে যা হয়েছে, তা তো সকলেরই জানা। তার শাসনামলে মালয়েশিয়া শিক্ষা, বিজ্ঞান ও কারিগরি ক্ষেত্রে একটি আধুনিক এবং অর্থনীতিতে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়।

মালেয়শিয়ার পরে কথা বলা যায় সিঙ্গাপুর নিয়ে। ১৯৫৯ সনে লি কুয়াং ইউ’ এর নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে পিপলস্ অ্যাকশন পার্টি। একটানা ১৯৮৪ পর্যন্ত দেশ শাসন করে পার্লামেন্টে বিরোধী দলীয় কোনও প্রতিনিধি ছাড়াই। তারপর থেকে এক-দুইজন করে সাংসদ বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বর্তমানে ৮৯ আসনের পার্লামেন্টে বিরোধী দলের প্রতিনিধি মাত্র ছয় জন সাংসদ। পার্লামেন্টের ভিতরে এবং বাইরে একটি দুর্বল বিরোধী দলের প্রেক্ষাপটে লি কুয়াং ইউ তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার মাঝে প্রাকৃতিক সম্পদবিহীন সিঙ্গাপুরকে তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশকে গড়ে তুলেছেন প্রথম বিশ্বের রাষ্ট্রে।

গত দশ বছরে বাংলাদেশে কী দেখেছি আমরা? বিএনপি মূলত দুর্বল হতে থাকে ২০০৯ এর নির্বাচনের পর থেকেই। বিএনপি ক্রমাগত পার্লামেন্টের ভিতরের মত, বাইরেও একটি দুর্বল বিরোধী দলে পরিণত হয়। পার্লামেন্টের বাইরে যতটুকু শক্তি ছিল, তা খাটিয়ে জামাতের মদদে ধর্মঘট, হরতাল থেকে শুরু করে নানা ধরনের জ্বালাও পোড়াও তৎপরতায় লিপ্ত থাকে। অবশ্য সরকারের শক্ত হস্তক্ষেপে তা ধীরে ধীরে সংকোচিত হয়ে আসে। আর ২০১৪ তে বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ফলে এরশাদ এবং রওশন এরশাদের জাতীয় পার্টি সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তাদের দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। তাতে কী? পার্লামেন্টে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের অবর্তমানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়।

দৃশ্যত বলা যায়, বিরোধী দল পার্লামেন্টের ভিতরে এবং বাইরে যত দুর্বল হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি তত বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠে। এই দাবিটি জিডিপির মাপকাঠিতেই দেখা যাক। বিশ্ব ব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী, ২০০৯ এ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের এক বছরের মাথায় জিডিপি হার দাঁড়ায় ৫ দশমিক ০৫ শতাংশ। ২০১০ এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৫৭২ শতাংশে। ২০১১ এবং ২০১২তে তা বৃদ্ধি পেয়ে যথাক্রমে ৬ দশমিক ৪৬৪ এবং ৬ দশমিক ৫২১ শতাংশে এসে দাঁড়ায়। ঠিক একইভাবে জিডিপি হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে যা ২০১৫ তে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৫৫৩ শতাংশে, ২০১৬ তে ৭ দশমিক ১১৩ শতাংশে এবং ২০১৭ তে ৭ দশমিক ২৮৪ শতাংশে। ২০০৯ সালের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৫.০৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮ সালে ৭.৮৬ শতাংশ হয়েছে। শুধু তাই নয়, অর্থনীতির চাকা এই ভাবে চলতে থাকলে আজকের অর্থনীতির পরিমাণ ৩০০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়ে ২০৩০ এ এসে তা দাঁড়াবে ৭০০ বিলিয়ন ডলারে।

তাহলে এটা প্রতীয়মান যে, গত দশ বছরে বিরোধী দল পার্লামেন্টের ভিতরে এবং বাইরে যতো দুর্বল হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি তত বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। সঙ্গত কারণেই, মালয়েশিয়ার মাহাথিরের কিংবা সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ এর মতো বাংলাদেশেও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় বিরোধী দল কতটা শক্তিশালীর প্রশ্নের চেয়ে সরকারী দলের প্রবৃদ্ধি দেখাটাই উত্তম মনে করেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এখানে একটি কথা না বললেই নয়, ২০১৩- ২০১৪ বিএনপি-জামায়াত, মহাজোটের সরকারকে উৎখাতের জন্য বেপরোয়া হয়ে উঠে এবং জ্বালাও- পোড়াও এর রাজনীতিতে মেতে উঠে যার প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতিতে। তাই, ২০১৩ – ২০১৪ এর জিডিপির হার ২০১২ এর তুলনায় খানিকটা নেমে আসে। এ থেকেও বোঝা যায়, বর্তমানের বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক মূল্যবোধের প্রেক্ষাপটে দেশের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে শুধু পার্লামেন্টের ভিতরে নয়, বাইরেও একটি দুর্বল বিরোধীদল অত্যাবশ্যক।

এখানে কারো সন্দেহ থাকার কথা নয়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক শাসনের ধারাবাহিকতা উন্নয়নশীল দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সহায়ক। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি দুর্বল বিরোধী দল চাওয়ার পিছনে একটি অতিরিক্ত কারণ হচ্ছে বিএনপি’র রাজনৈতিক মূল্যবোধের বিষয়টি যা স্বাধীনতার মূল্যবোধ ও জাতীয় দিকনির্দেশনার সাথে সংঘাতপূর্ণ।

সুষ্ঠু রাজনীতি প্রণয়নে বিএনপির সামনে একমাত্র পথ- একাত্তরের মূলধারায় বিশ্বাসী হয়ে ওঠা। অন্যথায়, দেশের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও কারিগরিতে আধুনিকীকরণ এবং অর্থনীতিতে সমৃদ্ধির স্বার্থে বিএনপি-জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে পার্লামেন্টের ভিতরে এবং বাইরে ক্রমাগত একটি দুর্বল দলই হতে থাকবে। সরকারেরও এমনটা না চাওয়ার কোন বিকল্প থাকবে না।